কাশ্মীরে ফেল হিন্দুত্ববাদ

গতমাসে কলকাতায় রাজ্য নির্বাচনে এককালের নকশাল পরে অভিনেতা মিঠুন চক্রবর্তী বুড়া বয়সে ছেলেকে বাচাতে বিজেপিতে জয়েন করেছিলেন। তাতে ঢলে পরা যৌবনের জোশ জজবা আনতে এই ফাঁপা ডায়লগ চালু করেছিলেন “মারবো এখানে, লাশ পড়বে শ্মশানে”। তো মোদীর এখন সেই দশা! আফগানিস্তান থেকে বাইডেনের অ্যামেরিকা ফিরে যাচ্ছে নিশ্চিত, তা বুঝে মোদী টের পেয়ে গেছেন যে তার হিন্দুত্ববাদের চরম ক্রাইসিসটা এখন আফগানিস্তানে নয়, কারণ লাশ পড়বে এখন কাশ্মীরে! ভারত এবার কাশ্মীর ধরে রাখতে পারবে কীনা সেই সঙ্কট আসন্ন! তাই আজকের আসল শিরোনামটা হওয়া উচিত ছিল সম্ভবত “মারবে আফগানিস্তানে লাশ পড়বে ভারতের কাশ্মীরে!

বিজেপি-আরএসএস এতদিন মনে করে এসেছে যে কংগ্রেস ও নেহেরু হিন্দু-শ্রেষ্ঠ জাতিবাদে বিশ্বাস করে ঠিকই কিন্তু এদের ঈমান খুবই দুর্বল। জোর খাটাতে জানে না। তাই এরা হিন্দুত্ববাদের উদগ্র ও নৃশংস-ক্ষমতার দিকটা পুরা ব্যবহারে নিতে পারেন নাই কখনও। একারণেই একচেটিয়া এক হিন্দু ভোট মেরুকরণের এর ব্যাপক সক্ষমতাটা ব্যবহার করতে পারে নাই। এখানেই বিজেপি কংগ্রেসের চেয়ে আগিয়ে ও শ্রেষ্ঠত্ব। আর তা থেকে ভারত রাষ্ট্রের অনেক অক্ষমতার মতই কংগ্রেস কাশ্মীরকেও ভারত নিজের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিতে পারে নাই। এতে নেহেরুর সবসময় পা-কাঁপেছে। বিজেপির চোখে এর বড় প্রমাণ হল, ভারতের কনষ্টিটিউশনে ৩৭০ ধারা যোগ করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা ও স্বায়ত্বশাসনের রাজ্য বলে স্বীকার করে এরপর কাশ্মীরের উপর ভারতকে অধিকার নিয়েছিলেন।

বিপরীতে মোদীর বিজেপি-আরএসএস মনে করে এসেছে তারাই হিন্দুত্ববাদের পুর্ণ ঈমানদার। কিন্তু কখনই ক্ষমতায় যেতে পারে নাই বলে আগে এই ঈমান ব্যবহারে নিতে পারে নাই, সবাই সাফার করেছে। তাই মোদীর সেকেন্ড টার্ম ২০১৯ সালের মে মাসে শুরু হবার পর এবার তারা হিন্দুত্ববাদের শক্তি সক্ষমতা ও মাহাত্ব প্রদর্শনের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। তিন মাসের মধ্যে, ৫ আগষ্ট ২০১৯ সালে মোদী-অমিত ৩৭০ ধারা বাতিল ঘোষণা করে কাশ্মীরকে ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে বলে মনে করতে থাকে। শুধু তাই না কাশ্মীর কোন রাজ্যই নয় সরাসরি কেন্দ্রের অধীনস্ত মানে মোদী-অমিতের অধীনস্ত প্রত্যক্ষ শাসনের ভুখন্ড করে নিয়েছিল। এককথাট এটাকেই “কলোনি দখল” বলে। কারণ এতে কাশ্মীরের বাসিন্দাদের কোন মতামত শুনার কোন জায়গা বা ব্যবস্থাই রাখা হয় নাই। এভাবেই চলছিল এতদিন!

 করোনা মহামরি, রাজনৈতিক ও দার্শনিক পর্যবেক্ষণ

কিন্তু এভাবেই মাত্র দুবছরো চলতে পারে নাই। হঠাত গত ২৪ জুন মোদী কাশ্মীরের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের সাথে দিল্লিতে নিজ বাড়িতে এক বৈঠকে বসেছিলেন। সেখানে মোদী বলেছেন, অচিরেই সময় মত কাশ্মীরের রাজ্য মর্যাদা ফেরত দিতে তিনি তিনি নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে চান। অনেকে বলছেন, মোদীর এই পশ্চাদ অপসারণ বাইডেনের পরামর্শ বা চাপ। এমনিতেই কাশ্মীর নিয়ে ভারত বাইডেনের সঙ্গে হাটতে পারছিলেন। মোদীর ভয় কাজ করত কখন বাইডেন কাশ্মীর প্রসঙ্গ তুলে বসেন।

লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি। বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!

কিন্তু ইতোমধ্যেই মোদীর এই পদক্ষেপ প্রমাণ করেছে যে অন্তত কাশ্মীরে “হিন্দুত্ববাদ” ব্যর্থ ও পরাজিত। হিন্দুত্ববাদের সিদ্ধান্তকে ফেলে মোদীর কাছে এখন বাইডেনের পরামর্শ শিরোধার্য। মানে প্রকারন্তরে মোদীকে বলতে হচ্ছে – কাশ্মীরকে ভারতের জবরদখল ব্যর্থ। কেন? কারণ মোদী স্বীকার করে নিলেন কাশ্মীর কার ও তা পরিচালিত হবে কীভাবে এই ব্যাপারে কাশ্মীরী বাসিন্দারাই আসল অথরিটি। তাদের সাথে কথা বলেই যেকোন সিদ্ধান্ত নিতে হবে। এতে হিন্দুত্ববাদ দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কোন জায়গা নাই। তাই কাশ্মীরের আইনি রাজনৈতিক দল যারা তাদের সাথেই মোদীকে কথা বলতে বসতে হল।আফগানিস্তানে আমেরিকায় পরাজয় বাকি সব পরাজয়ের ভাগ্যলিখন হতে যাচ্ছে। সেকারণে বলেছি হিন্দুত্ববাদ ক্রমশ মোদীর জন্য দায় উঠবে। মোদীকে এখন হিন্দুত্ববাদের জন্য কাফফারা দিতে পারতে হবে।
কেন?
লক্ষণীয় যে মোদীর সাথে কাশ্মীরের প্রায় সব আইনি রাজনৈতিক দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। তারা প্রায় ১৪ জন সিনিয়র মোস্ট নেতারা তাতে উপস্থিত ছিলেন, কিন্তু একটা দল বাদে। সে দলটার নাম বিজেপি। বিজেপির প্রতিনিধি থাকলে ঐ ১৪ জনের কেউ আসত না। তাই এই ব্যবস্থা। অর্থাৎ মোদীর হিন্দুত্ববাদ করার এক কাফফারা মোদী ইতোমধ্যেই চুকালেন!

শুরুর কথাঃ
আমেরিকা এ বছরই আগামী নাইন-ইলেভেনের মানে ১১ সেপ্টেম্বরের মধ্যে পরিপূর্ণভাবে আফগানিস্তান ছেড়ে চলে যাবে বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ও জানিয়েছে এবং সে মোতাবেক সিরিয়াস প্রস্তুতি নিচ্ছে।

কেউ মানতে চায়নি, কে আর মানতে চায় সাজানো বাগান ফেলে একদিন চলে যেতে হবে? না, দুনিয়া ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না। বলছি, এত দিন মানে গত ৭৫ বছরের দুনিয়া বলতে যেটা ছিল আমেরিকান ইচ্ছায় সাজানো একটা দুনিয়া, আমেরিকান গ্লোবাল নেতৃত্বের সেই দুনিয়া, তার কথাই বলছি। এরই অবসান হতে চলেছে। আর আপনি সেই সাজানো আমেরিকান দুনিয়াতেই থাকতে বাধ্য ছিলেন। আবার বিপরীতে যারা ছিল সেই আমেরিকার সভাসদ মানে আমেরিকার শাসন-সভায় একটা আসন পাওয়া দেশ যেমন ধরেন “ভারত” – তাহলে সেই ভারত কেন বিশ্বাস করতে চাইবে যে, আমেরিকার সাজানো দুনিয়া, ভারতের প্রিয় সেই দুনিয়াটা ক্রমেই শেষ হতে যাচ্ছে, একদিন আর থাকবে না!

কিন্তু বাস্তবতা হলো, সেটাই ঘটতে এবার সব নড়েচড়ে উঠেছে। এর যাত্রা শুরু হতে যাচ্ছে সম্ভবত আফগানিস্তান থেকে। কলকাতার ভাষাতেই যদি বলি ‘আফগানিস্তান থেকে আমেরিকার সব গুটিয়ে ছেড়ে যাওয়া নিয়ে ভারতের কপালে এবার বড় ভাঁজ পড়েছে।’ কেন? ভাঁজ পড়ার কী আছে?

দাবুদ মোরাদিয়ান (Davood Moradian) একজন তাজিক বংশোদ্ভূত আফগান ও হেরাত প্রদেশের বাসিন্দা। [তার নাম বাংলায় ঠিকমত উচ্চারণ করলাম কি না জানি না। কারণ এটা আফগান এবং বিশেষ এথনিক নাম। তাই আগেই মাফ চেয়ে রাখলাম।] একাডেমিকভাবে তিনি ইউকে মানে লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও স্কটল্যান্ডের সেন্ট অ্যান্ড্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের পিএইচডি। কাজ হিসেবে তিনি বর্তমান কাবুল সরকারের পররাষ্ট্র বিভাগের পরামর্শদাতা ও এক থিংকট্যাংকের আফগান শাখার ডিরেক্টর। তিনি সম্প্রতি এক প্রবন্ধ লিখেছেন, যা ছাপা হয়েছে ভারতের ‘দ্য প্রিন্ট’ পত্রিকায়। সেই শিরোনামটা বাংলায় বললে হয়, “আফগানিস্তানের সাথে জড়িয়ে থাকবে কি থাকবে না তা ভারতের জন্য কোনো সহজ প্রশ্ন নয়”। কিন্তু এর চেয়ে বড় কথা, তার লেখার ভিতরের একটা বাক্য আবার এ রকম – ‘আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে পালিয়ে যাওয়া এখন নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত, চীনের সাথে যুদ্ধের পরে ভারত তিব্বতের লাসায় থাকা ভারতের কনস্যুলেট জেনারেল অফিস গুটিয়ে নিয়েছিল। ভারত অবশ্য আগে ইতোমধ্যেই আফগানিস্তানের হেরাত ও জালালাবাদে ভারতের দুই আফগান কনসুলেট অফিস গুটিয়ে নিয়েছে”।

কিন্তু মজার কথা হল, দ্য প্রিন্ট পত্রিকা লেখার সারাংশ হিসেবে এই প্রথম বাক্যটা- “আফগানিস্তানকে পেছনে ফেলে চলে যাওয়া নয়াদিল্লির জন্য একটা পলিসি অপশন তো বটেই; ঠিক যেমন ১৯৬২ সালের মত” – এতটুকুই তুলে নিয়ে সেঁটে দিয়ে রেখেছে।

আমেরিকায় নাইন-ইলেভেন হামলার এক মাসের মধ্যে ততকালের আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জুনিয়র বুশ পালটা প্রতিশোধে আফগানিস্তানে সামরিক হামলা চালিয়ে সরকার ও প্রশাসন নিজ দখল নিয়েছিলেন। সে সময়ই আমেরিকার বিদগ্ধজন আপত্তি তুলে বলেছিলেন, এটা অপ্রয়োজনীয় ও বাড়াবাড়ি। মশা মারতে কেউ কামান বের করলে তার উদ্দেশ্য খারাপ বলতেই হয়। কিন্তু আফগানিস্তানে সামরিক হামলা করে ফেলার পরে আমেরিকার জন্য এই হামলার পক্ষে বিশ্ব-জনমত জড়ো করা আর এই হামলাকে সমর্থক রাষ্ট্রের সংখ্যা বাড়ানোর ছাড়া অন্য কিছু করার সুযোগ ছিল না। গ্লোবাল ডিপ্লোম্যাসিতে ভিন্ন কিছু করার আর সুযোগ ছিল না। সেই সূত্রে এশিয়ায় এক বড় জনসংখ্যার রাষ্ট্র ভারতল এর সমর্থন আমেরিকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এখান থেকেই ভারতও নিজেকে উল্টা এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে আমেরিকার কাছ থেকে সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে গিয়েছিল।

আর এখান থেকেই কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজমের ব্যাখ্যা ও যুদ্ধ প্রসঙ্গে ভারত-আমেরিকার এক ‘আনহোলি অ্যালায়েন্সের’ [Unholy Alliance বা অশুভ বন্ধুত্বের] যাত্রা শুরু হয়েছিল। কিন্তু যা এখন থেকে ক্রমেই অন্তত খোদ ভারতের বিপক্ষে তো যাবেই মনে হচ্ছে! কেন?

কাশ্মির প্রসঙ্গে শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

আমেরিকায় নাইন- ইলেভেনের হামলা ও প্রতিক্রিয়ায় আফগানিস্তানে আমেরিকার পালটা হামলা ও দখল এসব তো ছিল অ্যামেরিকা বা আফগানিস্তানের ভিতরের ঘটনা। কাজেই এর সাথে ভারতের নিজেকে ভিক্টিম মনে করার কী হল?

সেকালে ভারতের দিক থেকে কথিত জঙ্গিবাদ বা টেররিজম নিয়ে যে ব্যাখ্যা বয়ান ও সাফাই দেয়া হত তাতে, বিরাট এক মিথ্যা কথা ছিল। ‘সবচেয়ে বড় সেই ‘মিথ্যা ঘটনাটা” হল – কংগ্রেসের ১৯৮৭ সালের ভারতীয় কাশ্মিরের রাজ্য নির্বাচনে ব্যাপক কারচুপি করেছিল। এই ব্যাপক কারচুপি থেকেই কাশ্মিরের রাজনীতি ক্ষুব্ধ জনগণের মন উঠে যায়। আর তাতে এরপর কাশ্মীরের “সশস্ত্র পথ” জন-সমর্থন পেয়ে সংঘাতের রাস্তায় রওনা দিয়েছিল।কেন কোন দেশের রাজনীতি সশস্ত্র সংঘাতের পথে রওনা দেয় – ভারতের দেশে-বিদেশে এনিয়ে অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত আছে। এমনকি এ প্রসঙ্গে আমেরিকাসহ পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক গবেষণায় প্রাপ্ত অনেক রিপোর্টও পাওয়া যায় যেখানে বলা সারকথা ছিল, “কোনো দেশের জনপ্রতিনিধিত্ব বা প্রতিনিধি নেতা নির্বাচন ব্যবস্থায় হস্তক্ষেপ করার বিপদ কী, কেন একাজ করলে এরপর পরিস্থিতি সশস্ত্র রাজনীতির পথে চলে যায় এর ‘ক্লাসিক উদাহরণ হল’ ১৯৮৭ সালের ২৩ মার্চের কাশ্মিরের নির্বাচনের ব্যাপক কারচুপি।’’ অর্থাৎ পাবলিককে তার কথা বলা বা তার মতামত প্রকাশের পথ বন্ধ করে দিলে, প্রকাশিত হতে না দিলে, নির্বাচিত হতে না দিলে- দমবন্ধ সেই পরিস্থিতিই এরপর একে সশস্ত্র পথে যেতে আহ্বান রাখলে সে সহজেই সে পথ সমর্থন করে এগোবেই।

কাশ্মির প্রসঙ্গে শুরু থেকেই নেহরুর অপরাধের শেষ নেই। প্রধানতম অপরাধ, তিনি জাতিসঙ্ঘের রিকমেন্ডেশনে “গণভোটের” পথে যাননি। তবু চক্ষুলজ্জায় তিনি ভারতের কনস্টিটিউশনে লিখার সময়ে তাতে এক ৩৭০ ধারা যুক্ত করে কাশ্মিরকে ‘বিশেষ স্বায়ত্তশাসনের মর্যাদার রাজ্য’ হিসেবে ভারতের মধ্যে যুক্ত করে নেয়াটাকে জাস্টিফাই করতে চেয়েছিলেন; যদিও সেসব বিশেষ মর্যাদাও পরবর্তি বছরগুলো কিছুদিন পরপর একটা করে খুলে নেয়া হয়েছিল। তবু রাজ্য নির্বাচনী ব্যবস্থাটা কোনোমতে টিকে ছিল। আর সেটাও ১৯৮৭ সালের মার্চে শেষ করে দেয়াতেই কাশ্মির সশস্ত্র পথে চলে যায়। সরকারি হিসাবে কাশ্মিরের সশস্ত্র পথে যাত্রা জুলাই ১৯৮৮ সাল থেকে বলা হয়ে থাকে।

ভারতের ক্যারাভান ম্যাগাজিনকে ধরা হয় হাতেগোনা ‘নিরপেক্ষ ও পেশাদার জার্নালিজমের অন্যতম এক উদ্যোগ’ হিসেবে। গত ২০১৬ সালের তাদের প্রকাশিত এক রিপোর্টে [শিরোনাম ছিল How Mufti Mohammad Sayeed Shaped the 1987 Elections in Kashmir] – এই প্রসঙ্গগুলোই বিস্তারে তুলে এনে এক রিপোর্ট করা হয়েছিল। খুবই সংক্ষেপে বললে পেছনের সেই কাহিনীটা হল – রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যে নাকি বন্ধুত্ব খুবই মারাত্মক সলিড ছিল। বাস্তবত ফারুক আবদুল্লাহর বাবা শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন মূলত নেহরুর এক কাশ্মিরি প্রডাক্ট বলা যায়। কংগ্রেসের “নেহরুর কাশ্মিরি ভার্সন”। যে কাজ নেহরু নিজে করতে পারতেন না সেটা তিনি অনায়াসেই শেখ আবদুল্লাহকে দিয়ে করিয়ে নিতে পারতেন, এতটাই অনুগত ছিলেন শেখ আবদুল্লাহ। আসলে কাশ্মিরের রাজা হরি সিং ও তাঁর প্রশাসনিক চিফ সেক্রেটারিকে [Narasimha Ayyangar Gopalaswami] মোকাবেলা করার ক্ষেত্রে নেহরুর হাতিয়ার হয়ে থাকতেন এই ফারুক আবদুল্লাহ। ফলে রাজীব গান্ধী ও ফারুক আবদুল্লাহর মধ্যকার ‘সলিড বন্ধুত্ব’ বুঝতে আমাদের কষ্ট করতে হয় না। কিন্তু কত দূর এর সীমা? নির্বাচনে জবরদস্তি করে বন্ধুকেই জিতিয়ে এনে দেখাতেই হবে? বন্ধুত্ব কত গভীর? এত দূর?

‘ক্যারাভান’ বলছে ওই বন্ধুত্বের মাঝেই বাধা হয়ে [Gandhi and Abdullah’s friendship came in the way of Sayeed’s ambition to become chief minister] এসে গিয়েছিলেন কাশ্মীরের আরেক নেতা মুফতি সাঈদ। যিনি আসলে ভারতীয় কাশ্মিরের কয়েকটা ইসলামী দলের অ্যালায়েন্সে গড়া এক দলের মূল নেতা, যে দলের নাম মুসলিম ইউনাইটেড ফ্রন্ট [Muslim United Front (MUF)]। কারণ তিনি জিতে যাচ্ছিলেন ওই নির্বাচনে।

আমাদের বর্তমান লেখার প্রসঙ্গ তো আফগানিস্তান; সেখানে এর মধ্যে কাশ্মির প্রসঙ্গ ঢুকে গেল কোথা থেকে? আসলে, উপরে কথা বলছিলাম ভারতের নিজেকে এক ভিক্টিম বা ক্ষতিগ্রস্ত পার্টি হিসেবে সাজিয়ে বুশের ওয়ার অন টেররের প্রোগ্রামে ঢুকে পড়া আর সহানুভূতি সংগ্রহের লাইনে দাঁড়িয়ে যাওয়ার কথা। ১৯৮৭ সালের ওই নির্বাচনী কারচুপি যা থেকে পরে ১৯৮৮ সাল থেকে ভারতীয় কাশ্মিরের রাজনীতি সশস্ত্র পথে যাত্রা করেছিল, কংগ্রেস ও পরে বাজপেয়ীর বিজেপি কাশ্মীরের নির্বাচনী ব্যাপক কারচুপির এই ঘটনা লুকিয়ে উলটা – কাশ্মিরের সশস্ত্রতার উতস নাকি ‘সীমা পারকে আতঙ্কবাদ’ বা পাকিস্তান থেকে আসা টেররিজম বলে পাল্টা মিথ্যা বয়ান খাড়া করেছিল; যাতে অর্থ হয়ে যায়, সীমা পার মানে পাকিস্তান থেকে বা পাকিস্তানি কাশ্মির থেকে আতঙ্কবাদ বা জঙ্গিদের আসার কারণেই নাকি ভারতের কাশ্মিরের রাজনীতিতে সশস্ত্রতার সমস্যা শুরু হয়েছিল। আর সর্বশেষে আফগানিস্তানে বুশের দখলি হামলার পরে বুশ-বাজপেয়ী একমত হয়ে যান যে, তারা “একই সন্ত্রাসবাদের” শিকার হয়েছেন। আসলে ভারত নাকি আগে থেকেই ইসলামী জঙ্গি সন্ত্রাসবাদের শিকার (নির্বাচনী কারচুপির প্রতিক্রিয়া নয়)- এ কথাটা বুশের আমেরিকা থেকে স্বীকার করিয়ে নেয়ার বিনিময়েই ভারত স্বীকৃতি দিয়েছিল যে, আমেরিকাও ‘একই সন্ত্রাসবাদের’ শিকার। অতএব ওয়ার অন টেরর-ই সবার উপরের সত্য এবং ভারত-আমেরিকা তাই দু’জনে দু’জনার। আর সেই থেকে উল্টা আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতও [তারা নাকি টেররবিরোধী] বিরাট এক আমেরিকান পার্টনার হয়ে দাঁড়িয়ে যায়।

আবার আমেরিকার আফগানিস্তানে বোমা ফেলতে, হামলা চালাতে গেলে পাশের দেশে একটা সামরিক ঘাঁটি তো খুবই দরকার হয় যাতে সেদেশ থেকে মানে পাকিস্তানকেই আমেরিকার লঞ্চিং প্যাড হিসেবে – ঐ পাকিস্তানকেই আমেরিকার দরকার। অতএব এই যুদ্ধে আমেরিকার পক্ষে পাকিস্তানকে শামিল থাকতেই বাধ্য করা হয়েছিল। নইলে পাকিস্তানকেই আমেরিকার বোমা হামলা খেয়ে পুরান প্রস্তর যুগে পাঠিয়ে দেয়া হবে বলে আমেরিকান উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী [Deputy Secretary of State during President George W. Bush] পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফকে ফোনে হুমকি দিয়ে রাজি করিয়েছিলেন। সে কথা প্রেসিডেন্ট মোশাররফ ‘ইন দা লাইন অন ফায়ার’ বইয়ে উল্লেখ করে রেখেছেন। আর এখান থেকেই আমেরিকা সবসময় উল্টা ভারতকে দিয়ে পাল্টা অভিযোগ তুলিয়ে গেছে যে, খোদ পাকিস্তানই এক সন্ত্রাসবাদী রাষ্ট্র। সেজন্যই চারতের কাশ্মীরে সন্ত্রাসবাদ এসেছে। অর্থাৎ ভারতকে আমেরিকা ব্যবহার করেছে পাকিস্তানের উপর চাপ রাখতে।

আসলে দিন সবারই একদিন আসে! তাহলে এটা কি সেই বিশেষ মুহূর্ত? দিন বদলানোর দিন? দিন সবারই একদিন আসে! মেরা দিন ভি আয়েগা একদিন! সেরকম? কেন এমন বলছি?

সর্বশেষ এক্সিওস [AXIOS] ম্যাগাজিনে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের সাক্ষাৎকার (যেটা বহুল প্রচার করা হয়েছে বাংলায়; প্রথম আলোতে অনুবাদও হয়েছে) এর কথা ধরি তবে বুঝা যায় – ইমরানই আমেরিকার শেষ ভরসা– এই মনে করে বাইডেন প্রশাসন তাঁকে আঁকড়ে ধরতে চাইছে। কিন্তু ইমরান ততই শক্ত করে বলছেন, পাকিস্তানে আমেরিকার কোনো ঘাঁটি করতে তিনি দেবেন না। ওদিকে তালেবানেরাও আমেরিকার সবচেয়ে ছোট কোনো সামরিক স্থাপনাও আগেই নাকচ করে দিয়েছে।

Pakistan will not allow the CIA or U.S. special forces to base themselves inside his country ever again, he told Axios.

এর সোজা অর্থ আমেরিকা তাহলে কোথায় যাবে? তাহলে আলকায়েদা বা অন্যান্য ছোট বা বড় সশস্ত্র গ্রুপ যারা এত দিন আমেরিকান নানা ধরণের বোমা হামলা ড্রোন হামলা খেয়েও চুপ ছিল, চেপে থাকা এদের সাথে আমেরিকার যে সম্পর্ক ও ক্ষমতার সাপ্রেসড ভারসাম্য এত দিন ছিল, এর কী হবে? সেটা তো আর আগের ভারসাম্যে থাকবে না। সব ঢলে পড়তে বাধ্য! এটাই এখন দিন কে দিন প্রধান ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে চাইবেই! এবং এটাই হয়ে উঠতে পারে প্রেশার কুকারের ঢাকনা খুলে যাবার ঘটনা! আর তা হবে আফগানিস্তান থেকে কাশ্মীরসহ সবদিকে! এটাই মোদীর কাশ্মীরসহ এমনকি গত সাত বছরে মোদীর হিন্দুত্ববাদ ও এর সব পাপ সবকিছু উপড়ে ফেলে দিতে চাইতে পারে! অবস্থা এমন হবারও সম্ভাবনা যে মোদী বলতে পারেন – আমি হিন্দুত্ববাদ ত্যাগ করছি আমাকে ক্ষমতাচ্যুত করো না!

বাস্তবতা হল, সময় এখন আমেরিকার পক্ষেও না! আমেরিকার সাথে আর কেউ নতুন করে গাঁটছড়া বাঁধা দূরে থাক কোনো সম্পর্কই রাখতে চাইছে না। পাকিস্তান বা তালেবানদের আমেরিকার প্রতি অনাগ্রহ ও তুচ্ছাতিতুচ্ছ করার মনোভাব – আমেরিকার জন্য খুবই খারাপ ইঙ্গিত! এটাই প্রমাণ করে, আমেরিকার গ্লোবাল নেতা বা পরাশক্তি থাকার দিন আজ কোথায় ঠেকেছে। অতএব এমন আমেরিকার আড়ালে থেকে যে ভারত আমেরিকাকে সার্ভিস দিয়ে গত ২০ বছর মাখন খেয়ে গেছে, এর এখন কী হবে?

এ অবস্থায়, আফগান ইস্যুতে ভারত-আমেরিকার অবস্থান এখন যার যার নিজেকে বাঁচাও, নিজে বাঁচলে বাপের নাম! খুব সম্ভবত, আমেরিকার সাথে আগের মত গাঁটছাড়ায় থাকলেই হয়ত ভারতের বিপদ বেশি বলে ভারতের রিডিং। দিন এখন ভারতের পক্ষে আর নয়! আবার তাহলে ভারত কি এখন একেবারেই সবদিক থেকে হাত গুটিয়ে নিবে, এই ইস্যুতে অন্তত আমেরিকা থেকে সম্পর্ক ছিন্ন না করলের এক দুরত্ব রচনা করবে? সেটা ভারত বাস্তবায়ন করতে পারলে হয়ত এখন বেঁচেই যেত! এ কথার মানে কী? এর বাস্তবায়নও ভারতের হাতে আর নেই, তাই কী? হ্যাঁ, ঠিক তাই। কেন?

ভারতের মানে, সুনির্দিষ্ট করে এটা মোদির জন্য একেবারে বিজেপি-আরএসএস গোষ্ঠী ও তার হিন্দুত্ববাদের পাপ। তার ৫ আগস্ট ২০১৯ সালের ঐ ৩৭০ ধারা বাতিল করে কাশ্মিরকে একেবারে গায়ের জোরের ভিত্তিতে মানে ‘আইনগতভাবেই এর সংজ্ঞা দখলদার’ সেই হিসেবে পুরো কাশ্মিরই দখল করে ভারতের অংশ বলে ভারতে অন্তর্ভুক্ত করে ফেলেছিল। কারণ ঐ দিন ভারতীয় সংসদে অমিত শাহ পাকিস্তান ও চীনের কাশ্মির অংশও ভারতের বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন হিন্দুত্ববাদের প্রবল জোশে। বিজেপি-আরএসএস বলতে চেয়েছিল ১৯৪৭ পরবর্তি বছরগুলোতে তারা ভারতের ক্ষমতায় আসীন থাকলে এই ২০১৯ সালের মত করে – সারা কাশ্মীরই ভারতের ভুখন্ড বলে অন্তর্ভুক্ত করে নিত এবং নেহেরুর তা করা উচিত ছিল। নেহেরুর কার্ট দুর্বল, হিন্দুত্বের জোশ ব্যবহারের মোদী-অমিতের মত যোগ্য নয় বলে তারা সেসময় এটা করতে পারে নাই। সেই থেকে কাশ্মির ভারতের প্রত্যক্ষ অঙ্গ ভুখন্ড বলে মোদী সরকার হাতে বিবেচিত শুধু নয় কাশ্মীর আর প্রশাসনিক স্টাটাস হিসাবে ভারতের কোনো রাজ্যের মর্যাদাতেও নেই – এখনো ঘোষিত হয়ে আছে ।

অথচ প্রধানমন্ত্রী মোদির কানে এখন পানি ঢুকেছে মনে হচ্ছে! তিনি টের পেয়েছেন আমেরিকার আফগানিস্তান দখলের আগামী ২০তম বার্ষিকীতে আমেরিকা আফগান ছেড়ে একেবারে চলে গেলে, এর পরে সংশ্লিষ্ট যেসব গোপন ও সশস্ত্র সংগঠনের তৎপরতার ছড়িয়ে পরার সম্ভাবনা, এটাই জাতিইসংঘের আশঙ্কা [আফগানিস্তানে তালেবানের অগ্রযাত্রায় শঙ্কিত জাতিসংঘ] এদের বিরুদ্ধে ভারত একেবারেই ডিফেন্সলেস। এটা আবার ভারতীয় কাশ্মিরকে বড় সশস্ত্রতার পথে যেতে উসকে তুলতে পারে। মূল কারণ গত দুই বছরের মোদি সরকারের সাপ্রেশন ও এর প্রতিক্রিয়া!

কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

এদিকে ইতোমধ্যেই ভারতের দিক থেকে উদ্বেগজনক খবর হল, ইতোমধ্যে গত ২৭ জুন ভোর-রাতে ভারতের সামরিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার খবর এসেছে। অনেকে এটাকে কী পরিস্থিতি সামনে অপেক্ষা করছে এর ইঙ্গিত বলছেন।

তাহলে ভারতের দিক থেকে দাঁড়াল, এক দিকে সেই আমেরিকার মুরোদ আর নেই, আবার মোদি ইমরানের পাকিস্তানের সাথেও এত দিন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে, উল্টা বোমা হামলার নাটক করেছে চরমে। সরাসরি প্রচার করেছে ‘পাকিস্তান ঘৃণা’। আর এসব ঘৃণা-বিক্রি করে হিন্দুত্বের জিগির জাগিয়েছে আর তা দিয়ে নির্বাচনে হিন্দুভোট মেরুকরণ করেছে। অথচ এতদিনের পাকিস্তানের আগের দুই শাসক দল ও নেতাদের তুলনায় সবচেয়ে বিচারবিদ্ধিসম্পন্ন নেতা হলেন ইমরান খান। কারণ তিনি পেটি-পকেট স্বার্থ দিয়ে চলেন না। যার লঙ-টার্ম ভিশন এবং নয়া এপ্রোচ আছে। অথচ মোদী এসবের এক তিলও সুবিধা ভারতের স্বার্থ নিতে পারলেন না। কারণ, মোদীকে পাকিস্তান বা মুসলমানদের বিরুদ্ধে তিনি বীর এই মেরু করণ জোয়ার তুলে ভোটে জিততে হবে, তাই মোদীর এই সংকীর্ণ স্বার্থের নিচে ভারতের সামগ্রিক স্বার্থ চাপা পড়ে গেছে ও আছে। একারণে, ইমরানের পাকিস্তানের সাথে ন্যূনতম আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক মোদী করতে বা দেখাতে চায়নি। কারণ চরম মুসলমান বিরোধী ঘৃণা জাগানো- এটাই তো মোদির জন্য ভোটে হিন্দু ভোট মেরুকরণের একমাত্র কৌশল। কাজেই পাকিস্তানের সাহায্য চেয়ে একবার হাত বাড়িয়ে বসলে কী ডায়লগে গেলে এরপর মোদির নির্বাচনে জেতার বয়ানের কী হবে?

অতএব মোদী এখন অস্থিরঃ
অতএব মোদী এখন অস্থির; তার খারাপ দিনগুলো সামনে সম্ভবত আসন্ন। এই আশঙ্কায় তিনি অস্থির। এমনকি ইতোমধ্যে মোদি উল্টা রাস্তা ধরতে চাইতেছেন মানে তিনি হিন্দুত্ববাদ একেবারে ত্যাগ না করলেও যদি একটু ঢিলা করে দেন তাহলে কী পরিস্থিতি কিছুটা নিজ নিয়ন্ত্রণ ফিরবে? ইতোমধ্যেই তিনি এই ইঙ্গিত কাশ্মীরের রাজনীতিতে শো করে দিয়েছেন। আর এতেই তিনি নিজ কাশ্মিরের ব্যাপারে কত উদ্বিগ্ন; তা প্রকাশিত হয়ে গেছে। তিনি পরিষ্কার করেই কাশ্মিরি রাজনীতিবিদদের সাথে একটা বৈঠক করে ফেলেছেন। মোদী দিল্লিতে তার সরকারি বাসায় মিটিং আয়োজন করে ফেলেছেন। যার একেবারে মূল উদ্দেশ্য হল, তিনি আবার কাশ্মীরে নির্বাচনি রাজনোইতিক ততপরতা ফেরত আনতে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন – এই ম্যাসেজটা ছড়িয়ে দেয়া। কেন? কারণ কাশ্মীর যে এখন নয়া তালেবান প্রভাবের আফগানিস্তানের কারণে সসগস্ত্র রাজনীতির পথে জোরদার হয়ে যাচ্ছে এটা মোদী স্বীকার করে নিচ্ছেন। আর এবার সেই সশস্ত্র ধারাকে ফিরাতে ্মোদীর এক অসহায় পদক্ষেপের নাম হল এই বৈঠক। কাশ্মির আবার রাজ্য স্ট্যাটাস ফেরত পেতে পারে মানে সারকথায় তিনি হয়তো আর কঠোর দমননীতি নয়, আবার নির্বাচনী জানালা খুলতে চাচ্ছেন যদি পোষায়, এমন ইঙ্গিত দিতে চাচ্ছেন!

কিন্তু মূলকথা, ভারত আফগানিস্তান থেকে নিজেকে একেবারেই প্রত্যাহার করে নিলেই কি ভারতের কাশ্মির মোদির নিয়ন্ত্রণে থাকবে? সোজা জবাব হল, এর ন্যূনতম নিশ্চয়তাটুকুও নেই। হিন্দুত্ববাদের এমনই মহিমা। ভারতের কাছে এখন শুধু বাইডেনের আমেরিকাই নয়, ক্রমেই খোদ হিন্দুত্ববাদই এক লায়াবিলিটি হয়ে উঠতে চাইছে যেন।

অতএব আফগানিস্তান ইস্যুতে ভারতের জন্য কোনো অবস্থানই আশাপ্রদ নয়। সে কারণে সম্ভবত আফগান অ্যাকাডেমিক মিঃ দাবুদ মোরাদিয়ান এভাবে বলেছেন। ভারতের জন্য ন্যূনতম নিশ্চয়তাও কোথাও নেই। আবার ইরানের সাথে ভারতের সম্পর্কও খুবই খারাপ মাত্রায়। ইরানকে চরম অপমানজনক অবস্থায় ফেলার পরে আমেরিকার কথা শোনা ভারত আর ইরানের সাথে সম্পর্ক রাখতে চায়নি, ছুড়ে ফেলেছে। আজ এখন ভারতেরই মুখ নেই যে, ইরানের সাথে আবার কথা বলে আফগান ইস্যুতে কিছু পরামর্শ নেয় অথবা ওই অঞ্চলে ভারতের কোথাও পা দেয়ার জায়গা অন্তত ফেরত পায়। মনে হচ্ছে, কূটনৈতিক সব ইস্যুতে মোদির এখন সবচেয়ে বড় শত্রু হিসেবে হাজির হবে এত দিনের হিন্দুত্ববাদী পদক্ষেপগুলো!

ওদিকে আমেরিকা এখনো আশা করে আছে যে, অন্তত গোপন ঘাঁটি বা গোপন তৎপরতা চালানোর মতো কিছু জায়গা ইমরানের পাকিস্তান আমেরিকাকে দেবে!

সত্যি দুনিয়া বড়ই অদ্ভুত জায়গা! কখন যে কার দিন আসে। সে কারণেই সম্ভবত দুঃখের দিনের ভিতরে সবাই শান্ত্বনায় বলে ওঠে- হামারা দিন ভি আয়েগা! সব জুলুম বে-ইনসাফের বিচারের দিন হয়ে যায় যেন সেটা! মসানুষ এমন ভরসাতেই তো এখনও বাঁচে!

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
[email protected]

Advertisements