জার্সির লালে আড়াল নগ্ন সত্য

উন্ডিজ এর কাছে উদাম হয়ে যাবার পর অপেক্ষায় ছিলাম কর্তা মশাই কখন মুখ খোলেন সেটি দেখার জন্য। তিনি খুলেছিলেন আবার নিজেই বন্ধ করে দিয়েছেন। এই দুয়ের মাঝে তার একটি বয়ান নিয়ে কিছু কথা বলবো; এভাবে আর চলতে দেয়া যায় না! এটি আমি বহুদিন ধরেই বলছি, এভাবে চলতে পারে না। কিন্তু কি চলতে দেয়া যায় না এবং কি চলতে পারে না; এই বিষয়ে আমার সাথে কর্তা মশাইয়ের চিন্তার আসমান জামিন ফারাক রয়েছে।

এ আলোচনায় ঢোকার আগে একটা অপ্রিয় প্রসঙ্গ নিয়ে ফের একটু কথা বলি। বাংলাদেশ হারলেই ক্রিকেটের পেছনে করা লগ্নি নিয়ে এক পক্ষ ব্যাপক শোড় মাচায়। আমাদের কেন যেন একটা ধারনা তৈরী হয়ে রয়েছে যে, যাই ঘটে তার সবটাই আমাদের করের টাকায়। তাই এটি নিয়ে সরব হওয়া আমাদের সাংবিধানিক অধিকার! ক্রিকেটের পিছনে যা লগ্নি তা আমাদের করের টাকায় করা হয় নাই। এইটা বোর্ডের নিজস্ব আয়। বোর্ডের বহু অযোগ্যতা রয়েছে, এইটা সত্য। কিন্তু শূণ্য থেকে শুরু করে ক্রিকেটারদের পিছনে বিনিয়োগ করার মত অর্থ জোগান দেয়া তার মধ্যে পরে না। এই লগ্নি ফুটবলের পিছনে করলেও নাকি বেহতার হতো! তা, ফুটবল বোর্ডকে কামিয়ে করতে বলুন। কেউ বাধা ত দিচ্ছে না। বাস্তবতা হচ্ছে করের টাকার ব্যয় নিয়ে আমরা যতটা সরব কর দেবার ক্ষেত্রে ততটাই নীরব। তাই এই বিষয় নিয়ে হৈ চৈ হাস্যকর।

এবার আসেন কি চলতে পারে না, সেদিকে। একাদশ নির্বাচনে কর্তার হস্তক্ষেপ চলতে পারে না, টস জিতে দল কি করবে সে বিষয়ে কর্তার হস্তক্ষেপ চলতে পারে না, পিচ কেমন হবে সে নসিহত কর্তার কাছ থেকে আসবে; এটা চলতে পারে না, নাজমুল আবেদিন ফাহিম চলে যাবেন; সুজন সাহেব নসিহত করবেন এইটা চলতে পারে না, প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটকে টানা উপেক্ষা করা চলতে পারে না, ম্যাচ পাতানো নিয়ে বোর্ডের নীরবতা চলতে পারে না, পক্ষপাত মূলক আম্পায়ারিং দিয়ে লিগ চলতে পারে না। আমি নিশ্চিত করে বলে দিচ্ছি আমার ‘পারে না’র একটা অংশও কর্তা বাবুর মনোঃপত হবে না।

দেখেন টিভির সামনে বসে বিশেষজ্ঞের বয়ান দেয়া আর মাঠে নেমে খেলা দুইটা দুই জিনিস। খেলার অংশটুকু খেলোয়াড়দের হাতেই থাকা উচিত। টস জিতলে দল কি করবে সেটা ঠিক করার দায়িত্ব কর্তার না, সেটির জন্য টিম ম্যানেজমেন্ট রয়েছে। একাদশে কে থাকবে কে থাকবে না সেটা নির্ধারণ করার এখতিয়ার একমাত্র অধিনায়কেরই থাকা উচিত, কেননা দিন শেষে দলটা তাকেই চালাতে হয়। দলের শক্তির জায়গা, দূর্বলতা এগুলা ম্যানেজমেন্ট এর জানা বিষয়। সে দিক মাথায় রেখেই পিচ এর ডিমান্ড হত আগে। এটাকে শর্টকাটে নিয়ে যাওয়ার দায়টা কার? আমাদের ঘরোয়া ম্যাচগুলোতেও ত এমন পিচ থাকে না। সেখানে আপনি হোম কন্ডিশনের ফায়দা নেয়ার কথা বলে এমন এক কন্ডিশন তৈয়ার করছেন যেটা খোদ প্লেয়ারদের কাছেই অচেনা। এবং সেখানে খারাপ খেলার দায়ও সেই প্লেয়ারদের কাধেই চাপাচ্ছেন নিজেকে বাচাতে?

আমাদের কর্তারা খুবই প্রভাবশালী। কোন ক্যাপ্টেনের পক্ষে সম্ভব এমন পরিস্থিতিতে মন খুলে দল পরিচালনা করা? সে তার ক্রিকেট মস্তিষ্ক দেখানোর সুযোগটা পাচ্ছে কোথায়? অধিনায়কের এখতিয়ারভুক্ত সকল জায়গাতেই ত নগ্ন হস্তক্ষেপ চলছে। খেলোয়াড়দের উপর দায় চাপানো ত সহজ, যেহেতু তারা মাঠে খেলে। পর্দার পেছনের খেলা গুলো আড়ালে থেকে যায়।

আফগান টেস্টের কথা ধরুন। যার নূণ্যতম ক্রিকেট জ্ঞান আছে সেও বলবে যে মানের দিক দিয়ে আফগান স্পিনাররা আমাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে। এ সত্য অস্বীকার করে ত লাভ নাই। এইটা জানার পরেও আফগানদের হাতে স্পিনিং পিচ তুলে দেয়াটাকে কি বলবেন? এইটা হোম কন্ডিশনের সুবিধা নেয়া? আরে ভাই, মিরাজ মিডিয়ার প্রপাগান্ডা আর রশিদ পিউর ক্লাস; এইটারে অস্বীকার করে ত ফায়দা নাই।

এমন একটা পরিস্থিতি তৈরী করে রাখা হয়েছে যেটার সাথে খাপ খাওয়াতে না পেরে চলে গেলেন নাজমুল আবেদিন ফাহিম। ক্রিকেট জগতের সাথে যারা আছেন তারা প্রত্যেকেই জানেন উনার মাপের ক্রিকেট মস্তিষ্ক আমাদের দ্বীতিয়টা নাই। উনার বদলে আমরা ব্যবহার করছি কাকে? খালেদ মাহমুদ! ক্রিকেটারদের জিজ্ঞাস করেন, টেকনিকাল কোনো ইস্যুতে সমস্যা মনে হলে ফাহিম স্যার আর মাহমুদ দুজনের মধ্যে কার কাছে যাবেন তারা? ফাহিম স্যারের বদলে কেউ সুজনের নাম নিলে আমাকে বইলেন। সে ফাহিম স্যার কেন টিকতে পারলেন না সে বিষয় কি জানতে চেয়েছেন কর্তা মশাই? চাইবেন না, ঐটা জিজ্ঞাস করে মিডিয়ায় শিরোনাম হওয়া যায় না।

টেস্ট স্ট্যাটাস আমরা পেয়েছি প্রায় একুশ বছর। এই দুই দশকে প্রথম শ্রেণীর কাঠামোটা দাড়ালো না কেন? এখনো কেন নীচের পর্যায়ে কংক্রিটে নেট করা হয়? অভিজ্ঞতা থেকে বলি; পাকা পিচে নেট করে এসে মাটির উইকেটে খেলতে নামা হলো ফাইভের বই পড়ে এসএসসি দেয়ার চেষ্টার মত। সে জায়গায় কেন কাজ হচ্ছে না? এটি কেন চলতে দেয়া হচ্ছে?

নীচের পর্যায় থেকে খেলোয়াড়রা ক্রমাণ্বয়ে শিখে আসবে, এইটাই স্বাভাবিক। নীচের পর্যায়ে কি দেখছি আমরা? পাতানো ম্যাচ, পক্ষপাত মূলক আম্পায়ারিং। এগুলা চালিয়ে আপনি যদি ম্যাকগ্রা, পন্টিং ধাচের খেলোয়াড় আশা করেন তাহলে ভাই আপনি কোন স্বপ্নে আছেন খোদা মালুম। এগুলা বছরের পর বছর চলছে কেন?

সবচেয়ে নগ্ন সত্য হলো আমরা নিজেদের ঠিক কোথায় দেখতে চাই সে বিষয়ে আমাদের কোনো ধারনা নাই। আপনি যদি নিয়মিত টেস্টে ভালো করতে চান সেটার জন্য প্রথম শ্রেণীকে মানে তোলার বিকল্প নাই। সে পথে বোর্ড কবে হেটেছে? আমাদের প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটকে বলা হয় পিকনিক ক্রিকেট! যে জায়গা থেকে খেলোয়াড়রা শিখে আসবেন সেটার এই হালত চলতে দেয়া যায়?

আমাদের মধ্যে একটা মিথ্যা ধারনা তৈরী করে দেয়া হয়েছে যে বাংলাদেশ খুবই ভালো একটা দল। এর পুরো দায় মিডিয়ার। জিতলেই রঙ্গচঙ্গ মাখিয়ে এমন সব খবর প্রকাশ করে মনে এই বুঝি ব্রাডম্যানের কাছাকাছি কাউকে পেয়ে গিয়েছি আমরা। একটা ভালো টেস্ট দলে কমপক্ষে দুজন ব্যাটসম্যান আপনি পাবেন যাদের গড় চল্লিশের বেশি। আমাদের এত বছরে একজন মাত্র ব্যাটসম্যান রয়েছেন এ গড়ের, মুমিনুল। এইটা মান মাপার বেসিক একটা পদ্ধতি। গড় সব বলে না সত্য, কিন্তু একেবারে যে কিছু বলে না তাও না। আপনার দলে যারা রয়েছেন তারা ফেলনা না, আবার ঐ মানেরও না যে মান ফুলিয়ে ফাপিয়ে দেখানো হয়। এদের কাছে আমরা যা প্রত্যাশ্যা করি সেইটা আমার চোখে অন্যায় প্রত্যাশা। মিরাজের কাছে মুরালির মত পার্ফর্ম্যান্স আশা করাটাই ত আশ্চর্য।

শেষ ম্যাচটা দেখুন। ব্রাথওয়েটের প্রত্যেকটা সিদ্ধান্ত ক্লিক করেছে। আমি শুধু নাঈমের আউটটুকু নিয়ে একটু বলি। প্রথম দুইটা বল যখন লেগ সাইড দিয়ে বের হয়ে গেলো আমরা ধরেনই নিয়েছিলাম তিনি বেহুদা ওভারটা নষ্ট করতে এসেছেন। কিন্তু ঐ জায়গাতেই বল ফেলে নাঈমকে বোকা বানিয়ে তিনি কিন্তু কাজের কাজটা করে দেখালেন। এটা ত হুতাশে হয় নাই। স্পষ্ট বোঝা গেলো তিনি জানতেন তিনি কি করতে চান। আর এই জানার প্রক্রিয়াটা তিনি শিখেছেন প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেট থেকে। চোখের সামনে এটি দেখে আমরা হম্বি তম্বি করছি দলের খেলোয়াড়রা কে কোন শট খেলেছে তা নিয়ে!

বাস্তবতা হলো আমাদের জাতীয় দলের অধিকাংশ খেলোয়াড়ই ঘরোয়া লিগকে গুরুত্ব দেন না। অনেকে খেলেনই না। এ চর্চা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ভালো করতে হলে আপনাকে হতে হবে এক্সট্রা অর্ডিনারি। যা এই দলে সাকিব ছাড়া কেউই নন। এই জায়গায় নীরবতা চলতে পারে না। প্লেয়ারদের বলতে গেলেও ত বাধে। আপনি জানেন মৌসুমের শুরুতে আপনাকে টেস্ট খেলতে হবে। সেটার প্রস্তুতির কোনো বন্দোবস্ত ত নাই। প্রথম শ্রেণীর ক্রিকেটই নাই। খেলোয়াড়রা শুধু নেট করে টেস্ট খেলতে নেমেছে এবং আমরা প্রত্যাশা করছি তারা টেস্ট জিতে আসবে!

মূল কথা হলো আমাদের মিথ্যার জগত থেকে বের হয়ে আসতে হবে। তা না হলে মিডিয়া কাভারেজ হয়ত পাওয়া যাবে কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হবে না। হয় নাই, হচ্ছেও না।
লেখকঃ ক্রীড়া সম্পাদক,জবান