আফগানিস্তানে অস্ট্রেলিয়ান যুদ্ধাপরাধ

আল-জাজিরার মতামত বিভাগে প্রকাশিত সাহার ঝুমখোর লেখাটি “ভাওয়াল বার্তার” পাঠকের জন্য তরজমা করেছেন ভাওয়াল বার্তার সহ-সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম ।


কয়েক সপ্তাহ আগে আফগানিস্তানে অস্ট্রেলিয়ান প্রতিরক্ষা বাহিনীর যুদ্ধাপরাধের বিষয়ে চার বছরের তদন্তের বেদনাদায়ক বিবরণ অবশেষে জনগণের কাছে প্রকাশ করা হয়েছিল। দেশটি মারাত্মক ২৩ টি ঘটনা ঘটিয়েছে,যাতে শিশুসহ ৩৯ জন আফগান বেসামরিক লোক নিহত হয়েছে ।স্পেশাল এয়ার সার্ভিস রেজিমেন্টের (এসএএস) কমপক্ষে ২৫ অস্ট্রেলিয়ান সেনা এর সাথে জড়িত।

প্রতিবেদনে “রক্তপাতের” এক বর্বর চিত্র ফুটে উটে,উর্ধ্বতন কমান্ডাররা বাহিনীর সৈন্যদের হত্যা এবং তথ্য গোপন করার পদ্ধতি শিখিয়ে দিয়েছিল। প্রত্যক্ষদর্শীরা চুপ থাকতে বাধ্য হয়েছিল এবং হত্যাকারীরা ভুয়া তথ্য প্রচার করে হত্যার ঘটনা গোপন করেছিল ।

অপরাধের বিবরণ ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরে,অস্ট্রেলিয়ায় এই সহিংসতার ব্যাখ্যা এবং এর বর্ণবাদী উৎসটির সন্ধান করতে অনীহা প্রকাশিত হয়েছে। প্রকাশিত খবরে স্থানীয় মিডিয়া কভারেজে রক্ষণাত্মক সুর ছিল।

সামরিক, একাডেমিক এবং মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সেনাবাহিনীর ঐক্য এবং প্রতিরক্ষা বাহিনীর চিত্র এবং মনোবলের উপর প্রভাব নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করার জন্য অস্ট্রেলিয়ান টিভি পর্দায় হাজির হয়েছিল। অস্ট্রেলিয়ার কর্মকর্তা এবং ধারাভাষ্যকাররা যুদ্ধাপরাধকে একটা সামন্য অপরাধ হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছে, যেমনটা তাদের আমেরিকান সহযোগীরা ইরাকের আবু ঘরাইব কারাগারে বন্দিদের সাথে করে থাকে।

এমনকি যখন যুদ্ধাপরাধের ভয়াবহতা পূর্ণ প্রকাশিত হচ্ছিল এবং যুদ্ধাপরাধ এবং ঘৃণ্য চর্চার মাত্রাটা সত্য হিসাবে প্রমানিত হয়েছে, তখনও শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের নির্দোষ প্রমাণের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছিল।

কিন্তু অস্ট্রেলিয়ায় বসবাসকারী একজন আফগান হিসেবে যা আমাকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে তা হচ্ছে কীভাবে অস্ট্রেলিয়ান টিভিতে তদন্ত বিষয়ক আলোচনার কভারেজ শেষ হয়েছিল। কভারেজ শেষ হয়েছিল সামরিক সদস্য এবং তাদের পরিবারের সদস্যদের মানসিক চিকিৎসা দেওয়ার মাধ্যমে । এইটা এমন এক সময় ঘটেছে,যখন বছর ব্যাপী বিশ্বব্যাপী ইউনিফর্মযুক্ত পুরুষদের বিরুদ্ধে নাগরিক জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসিত করা এবং দায়মুক্তির অভিযোগে আন্দোলন চলছে ।

হত্যা সম্পর্কে তাদের অবস্থান ছিল বিস্ময়কর,স্বার্থপর এবং নারকীয় । মিডিয়াতে উপস্থিত ছিল না ক্ষতিগ্রস্থদের জন্য কোনও উদ্বেগ এবং প্রকাশ পায়নি আফগান ও অস্ট্রেলিয়াতে বসবাসকারি আফগানদের কোন অনুভুতি। আমরা অনেকেই যুদ্ধের ক্ষত বহন করি এবং তাদের অনেকেই এই কর্মকান্ডের ফলে মর্মাহত হয়েছেন।

সেনাপ্রধান অ্যাঙ্গাস ক্যাম্পবেল এই প্রতিবেদন প্রকাশের দিন আফগানদের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেছেন। কিন্তু তিনি কৌতূহলজনকভাবে এই প্রতিবেদনের উপসংহার পুনরাবৃত্তি করেন যে এই সব অপরাধ “যুদ্ধের উত্তাপে” ঘটেনি। অর্থাৎ আমাদের কাছে ৩৯টি অবৈধ হত্যাকাণ্ড এবং আরও অনেক কিছু ঘটনা আছে যা অবশ্যই “বৈধ” হতে হবে, যেগুলা “যুদ্ধের উত্তাপে” অস্ট্রেলিয়ার সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ।

এভাবেই তথাকথিত “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের নামে” পশ্চিমারা বেসামরিক মানুষদের বা সন্দেহভাজন সন্ত্রাসীদের ক্ষয়ক্ষতি করে, অত্যাচারীকে বীর হিসাবে, মুক্তিযোদ্ধাকে সন্ত্রাসবাদী ও সন্ত্রাসবাদীদের মুসলমান হিসাবে উপস্থাপন করে । “সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের” নামে যে বর্ণবাদী অর্থনীতি গড়ে উঠেছে তা কৃষ্ণ ও বাদামী জীবনকে সস্তা, মূল্যহীন মনে করে। সন্ত্রাস বিরোধী যুদ্ধের নামে আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ইরাকে অর্ধ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ হত্যা করা হয়েছে, কিন্তু হত্যাকান্ডের এই ভয়াবহ বিবরণ কোন রিপোর্ট এ উঠে আসেনি ।

পশ্চিমাদের হত্যাকান্ডকে স্বাভাবিক করতে বিশ্বের কিছু অংশে রক্তপাত, নাগরিক হত্যা এবং বন্দীদের নির্মমভাবে হত্যা করাকে নিয়ম হিসাবে জারি রাখে। যেখানে সাদা কর্তৃক নিরপরাধ ব্যক্তিদের হত্যাকে স্বাভাবিক মনে করা হয়। এখানেই সাদারা নিজেদের শ্রেষ্ট, সর্বশক্তিমান এবং স্পর্শাতীত ভাবতে থাকে।

কেন এই ধারাবাহিক রক্তপাত। এটা প্রথমিকভাবে এমন কিছু ইঙ্গিত করে যা এই শব্দটার মধ্যেই নিহিত আছে। এটা একটা বিমানবীকরণ প্রকৃয়া আছে। স্থানীয়দের এমন ভাবে বশীভূত করে যে তারা নিজেদের উচ্চতর কোন কিছুর স্বার্থে পশুর মতো বলি দিতে প্রস্তুত থাকে। এটা এমন একটা নিয়তি যা এই কালের একটা রীতি হয়ে উঠছে। সাদাদের ধারাবাহিক হত্যা,ধর্ম রক্ষার নামে জুলুদের বলি দানের মত। যাকে ব্রিটিশ স্পেশাল ফোর্স এসএএস’র কাজের সাথে তুলনা করা যায়। আর ঔপনিবেশিকদের ইতিহাসই হইলে হত্যার ইতিহাস।

অস্ট্রেলিয়ানদের এই হত্যাকান্ডের সাথে পরিচিত থাকার কথা। কেননা এই জাতির দেশীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিরুদ্ধে নগ্ন সহিংসতা ও হত্যার একটা ইতিহাস রয়েছে।

সাদারা আদি ঔপনিবেশিক আচরনের দিকে ফিরে গেছে। আফগানিস্তানে সাম্রাজ্যবাদীদের কবরস্থান এইটা একটা কাল্পনিক চিন্তা, কেননা আফগানিস্থান এমন একটা জায়গা যেখানে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের চিন্তা সহজেই প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে।

ঔপনিবেশিক আমলে সাদারা ট্রফি হিসাবে মানুষের মাথা নেওয়াকে গর্বের ব্যাপার মনে করত। এখন তারা মৃত আফগানদের দেহের অংশ এবং তাদের দেহের কৃত্রিম অংশকে মদ পানপাত্র হিসাবে ব্যবহার করে।

ল্যান্ডমাইন দ্বারা আবৃত একটি ভূমি থেকে আফগানীদের শরীরের খন্ডিত অংশ , এমনকি দেহে ব্যবহারকৃত প্লাস্টিকের অংশ অধিকরণের আকাঙ্ক্ষা সাদাদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয়। আমি অস্ট্রেলিয়ানদের দেখে বিস্মিত যারা একজন মৃত আফগান ব্যক্তির কৃত্রিম পা চুরির সাক্ষী ছিল অথবা জানতো যে এটা কোথা থেকে এসেছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও, শরীরের অংশ দিয়ে তৈরি পানপত্র দিয়ে বিয়ার পান করতে পছন্দ করে।

আমি ২০১০ সালে টাইম ম্যাগাজিনের সামনের প্রচ্ছদে আসা আফগান মেয়ে আয়েশা মোহাম্মদজাইয়ের বিকৃত চেহারার কথা চিন্তা করি, যাকে এরপর আমেরিকায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং প্লাস্টিক সার্জারির মাধ্যমে তার নাক প্রতিস্থাপন করে দেওয়া হয়।শরীরের অংশ হিসাবে প্লাস্টিক আফগানিস্তানে শক্তিশালী একটা পণ্য। এই ঘটনা দিয়ে সাদারা প্রমাণ করতে চায় যে তারা দেহের অংশ দিতেও পারে এবং নিতেও পারে।

গল্পটির ছলনাপূর্ণ অংশটি হ’ল কীভাবে সাদা পুরুষরা ইচ্ছামতো হত্যা করতে পারে, লাশ বিকৃত করতে পারে, শরীরের অংশগুলি চুরি করতে পারে এবং এগুলার পরও সাদারা নিজেদের শ্রেষ্ঠ হিসাবে চিন্তা করে।

পশ্চিমাদের বেসামরিক নাগরিক হত্যা এবং যুদ্ধাপরাধের ঘটনাবলি ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হওয়ার পরও আফগান যুদ্ধ নিয়ে পশ্চিমাদের বয়ান হইল যে, আফগানে তাদের সৈন্যরা ত্রাণকর্তা হিসেবে রয়েছে ।

পশ্চিমারা আফগান যুদ্ধকে “good war বা উপযুক্ত যুদ্ধ” হিসাবে দেখে, যা ইরাকে যুদ্ধের মত না, কেননা ইরাকের যুদ্ধটা মিথ্যার উপর ভিত্তি করে হয়েছিল। তবে এইটা বিস্মিত হওয়ার মত ঘটনা যে, একই দেশ যারা ইরাকে মিথ্যা অজুহাত দেখিয়ে যুদ্ধ করেছিল, তাদের আফগান যুদ্ধের অজুহাতটা কি সঠিক?

আফগানে আক্রমণের পশ্চিমানের একটা হস্যকর বয়ান হইল যে, তারা মুসলিম মেয়েদের মুক্তি ও পুরুষদের অধীনস্ত থেকে আজাদ করাই তাদের যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য।

কিন্তু মানুষ ভুলে যায় যে যুদ্ধের আসল যৌক্তিকতা আফগান নারীদের সুরক্ষা ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র এবং তার মিত্ররা প্রাথমিকভাবে ঘোষণা দেয় যে তারা আত্মরক্ষার জন্য হামলা চালাচ্ছে কারণ আফগানিস্তান আল-কায়েদা এবং তার নেতা ওসামা বিন লাদেনকে আশ্রয় দিয়েছে, যাকে ৯/১১ হামলার আদেশ দেয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছিল।

কিন্তু যুদ্ধটা আত্মরক্ষার নামে হয়েছিল পশ্চিমাদের এই বয়ান সঠিক ছিল না। আগ্রাসনের সময় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোন চলমান সশস্ত্র হুমকি ছিল না, নিরাপত্তা পরিষদ সময়মত তা অনুমোদন করেনি, আফগানিস্তান কোন আগ্রাসী জাতি ছিল না, বিন লাদেন কোন সামরিক হস্তক্ষেপের পরোয়ানা জারি করেনি এবং তালেবানরা আসলে সমঝোতার জন্য প্রস্তুত ছিল।

পশ্চিমা ও তাদের মিত্রদের যুদ্ধের শুরু ছিল প্রশ্নবিদ্ধ । যুদ্ধের উদ্দেশ্য দ্রুত আত্মরক্ষা থেকে আফগান নারীদের রক্ষা এবং তালেবানদের অপসারণের দিকে সরে যায়। যুদ্ধের নতুন এই মৌড়ের কারণে অবৈধ যুদ্ধ শুরুর বয়ান ঢাকা পড়ে যায়।

পশ্চিমাদের এই মানবিক প্রবণতা আফগানদের আত্মরক্ষার অধিকার এবং আত্মসংকল্পের অধিকারকে খর্ব করে। “good war” বয়ান এমনভাবে উপস্থাপিত হয় যার কারণে মনে হয় যে, আফগান নারীরা স্বাধীন নয়, আফগান রাজনৈতিক ইচ্ছা যা মানবিক আদর্শের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় এবং তাদের সামাজিক বা রাজনৈতিক চিন্তাটা সমাজের জন্য হুমকি স্বরুপ।

ভয়াবহ যুদ্ধাপরাধের প্রমাণ যখন বাড়ছে, তখন অস্ট্রেলীয়সহ পশ্চিমারা বর্ণবাদী কল্পনাকে ধরে রেখেছে যে তারা আফগানিস্তানে একটি “ভালো যুদ্ধ” করছে, তাদের যুদ্ধক্ষেত্রের সীমানা চিহ্নিত করার নৈতিক অধিকার আছে, তারা সিদ্ধান্ত নিতে পারে যে কে বেসামরিক নাগরিক এবং কে তালেবান।

এইগুলা পশ্চিমাদের বিকৃত মানসিকতার পরিচয়। আর দানব এবং দানবদের যারা জন্ম দেয় তাদের আচরণ এমনই । অনেক আফগানরাও মনে করে দানবদের আচরণ এমনই।