আন নাহদা ও তিউনিসিয়া

এক- তিউনিসিয়ার ঘটনাবলীতে যারা বিদেশি ষড়যন্ত্র খুঁজছেন, মোটা দাগে তারা ভুল। হ্যাঁ, বিদেশি মদত একবারেই ছিল না তা নয়, কিন্তু মূল সংকটটা তিউনিসিয়ার অভ্যন্তরীন।

তিউনিসিয়ার স্বাধীনতার স্থপতি ধরা হয় হাবিব বারগুইবাকে। সে ছিল আতাতুর্কের ভাবশিষ্য। তার একমাত্র স্বপ্ন ছিল তিউনিসিয়াকে সাবেক দখলদার, যাদের কবল থেকে সে দেশকে আপাত ‘উদ্ধার’ করেছে সেই ফরাসিদের আদলে ঢেলে সাজানো।

বিশ্বে সর্বপ্রথম হিজাব নিষিদ্ধ হয়েছে কোন দেশে জানেন? তিউনিসিয়ায়! একটি আপাদমস্তক সুন্নি মুসলিমপ্রধান দেশ!! এই ‘কৃতিত্ব’ পুরাটাই বারগুইবার। সে রমজান মাসে টিভি চ্যানেলে প্রকাশ্যে জুস পান করত,সেটা দেশব্যাপি প্রচার করা হত। মরার আগ পর্যন্ত তার দুঃখ ছিল- রমজানে প্রকাশ্যে একদিন মদ খেতে পারল না! ক্ষমতা হাতে পেয়েই সে দেশের নারীদের জন্য ড্রেসকোড ঠিক করে দেয়।

তিউনিসিয়ায় ইসলামিস্ট-সেক্যুলারিস্টদের দ্বন্দ্ব কত প্রকট, কত তীব্র তা বুঝতে তথ্যগুলো প্রয়জন। ইসলামিস্টদের হটাতে বহিরাগত মদতের প্রয়োজন নেই, দেশের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বই এর জন্য মোর দ্যন এনাফ।

যেই বেন আলিকে আরব বসন্তের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে, ক্ষমতায় আসার পর পর সে একটি নির্বাচন দিয়েছিল, সামরিক শাসকরা ক্ষমতার বৈধতার জন্য যে ধরনের নির্বাচন মঞ্চস্থ করে থাকে, সে ধরনেরই।কিন্তু সব হিশাব নিকাশ উলটে দিয়ে, কঠোর নজরদারির মধ্যেও ইসলামিক দল আন নাহদা জাতীয় ভোটের ১৭%, এবং কোন কোন এলাকার ৩০% ভোট নিয়ে নেয়!

বেন আলি সতর্ক হয়ে যায়। সে বুঝে যায় তার ভবিষ্যত শত্রু একমাত্র এই আন নাহদা। ১৯৯২ সাল নাগাদ ইসলামিস্টদের ভাগ্যে নেমে আসে ভয়াবহ নিপীড়ন। কঠোরভাবে সারাদেশে তাদেরকে দমন করা হয়। দাড়ি রাখা কিংবা নামাজ পড়ার মত ‘গুরুতর’ অপরাধেও তাদেরকে ঢালাও গ্রেফতার করা হত। মসজিদ্গুলোতে তীব্র নজরদারি চলত।

নব্বইয়ের দশকের শেষ নাগাদ তাদের অনেককেই মুক্তি দেওয়া হয়, কিন্তু তাদের কাউকেই স্বাভাবিক জীবন যাপনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা ছিল। চাকরিতে নিষেধাজ্ঞা ছিল। মাসে ন্যূনতম একবার ‘সিকিউরিটি চেকআপের’ ভিতর দিয়ে যেতে হত। কারো প্রতি সপ্তাহে। আর যাদের ভাগ্য ভাল তারা দৈনিক কয়েকবার আদালতে হাজিরা দিতে হত।

এরকম একটা দেশে, যেখানকার সেক্যুরা বাঙালি সেক্যুদের চেয়ে ঢের সরস, সেখানে অভ্যুত্থান হওয়াটা কোন আশ্চর্যের বিষয় না, বরং প্রকৃত আশ্চর্যের বিষয় হচ্ছে তারা কিভাবে ক্ষমতায় এলো, তার উপর প্রায় একদশক টিকেও গেল!? এটাই মিরাকল।

করোনা মহামরি, রাজনৈতিক ও দার্শনিক পর্যবেক্ষণ

দুই- আন নাহদার পতনে দেখলাম অনেক ‘ইসলামিস্টরাও’ বগল বাজাচ্ছেন। কারণ নাহদা ‘সেক্যুলার’ হয়ে গেছে। মহা অপরাধ। তারা একটু কষ্ট করে খতিয়ে দেখতে যান না কিভাবে নাহদা ক্ষমতায় এলো। বিপ্লবের পরও কি তাদের ক্ষমতারোহণটা খুব সহজ ছিল?

বিপ্লবের পর খুব স্বাভাবিকভাবেই বাম-সেক্যু মহলে আতংক ধরে যায়- দেশটা নির্ঘাত ইসলামিস্টদের দখলে যাচ্ছে! তারা প্রতিদিনই বেজি সাইদ এসেবসির অফিসে ভীড় জমাত। ‘দ্যাশটা রসাতলে যাচ্ছে, ইসলামিস্টরা ক্ষমতা দখল করে নিচ্ছে, তাদেরকে কচুকাটা করুন, মেরে সাফ করে দিন, জাস্ট আদেশ দিন, সবগুলোকে সাফ করে ফেলব’ এই ছিল নিত্যদিনকার আবেদন নিবেদন।

বেজি সাইদ এসেবসি হচ্ছেন তিউনিসিয়ার সবচেয়ে অভিজাত, সম্ভ্রান্ত এবং সম্মানিত বাম রাজনীতিবিদ। সেনাবাহিনি থেকে শুরু করে সেক্যু,বাম এমনকি অনেক ইসলামিস্টদের চোখেও তিনি ছিলেন শ্রদ্ধার পাত্র। আন নাহদার সরকারে ২০১৯ সাল পর্যন্ত তিনি দেশের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। ফরাসিদের সময় থেকেই তিনি দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি।

তিউনিসিয়া যে সিরিয়া কিংবা লিবিয়া হয়নি তার একমাত্র ক্রেডিট আন নাহদার ‘মুরতাদ’ নেতা রশিদ ঘানুশির আর বেজি সাইদ এসেবসির। আবারও বলছি- একমাত্র ক্রেডিট এই দুইজনের।

শুধুমাত্র তাদের বিচক্ষণতার বদৌলতে তিউনিসিয়া বেঁচে গেছে। বেঁচে গেছে লক্ষ লক্ষ বনি আদম। এতদিন যে বাম-সেক্যুরা ক্যু করতে পারেনি, তারও অন্যতম কারণ সাইদ এসেবসি। ২০১৯ সালে তার মৃত্যুর পর থেকেই মূলত তারা গা ঝাড়া দিয়ে উঠে।

ঘানুশি-এসেবসি প্রথম বৈঠক হয়েছিল প্যারিসে, হোটেল ব্রিস্টলে। এসেবসি সেখানে গিয়েছিলেন মেডিক্যাল চেকআপের বাহানায়। আর ঘানুশি গিয়েছিল কাউকে না জানিয়ে, এমনকি তার দলের নেতৃবৃন্দও জানত না।

কঠোর গোপনীয়তার মধ্য দিয়ে এই বৈঠক হয়েছিল। কারণ দুইজনই জানত তাদের একে অপরের সাথে বৈঠকের বিষয়টা ফাঁস হওয়ামাত্র উভয়কেই নিজ নিজ দল থেকে বহিস্কার করা হবে। ঘানুশির ভাগ্যে এটা ঘটতে যাচ্ছিলও। তাদের উপর কী পরিমাণ চাপ ছিল তা বুঝা যায় যখন হোটেল ব্রিস্টলের ফুল স্পিড এসিতে বসেও দুই ঘাঘু রাজনীতিবিদ দরদর করে ঘামছিলেন।

ইসলামিস্টদের নাশ করার আবেদন নিয়ে যেসব বামরা আসত, তাদের জবাবে এসেবসি বলতেন যদি আমরা কামড় দেই, ইসলামিস্টরাও পালটা কামড় দেবে। সেটা হবে মরণকামড়। আমাদের কামড়াকামড়িতে ধ্বংস হবে তিউনিসিয়া। সো ধৈর্য ধরো।

তারপর এই দুইজনের মাঝে বহু গোপন বৈঠক হয়। কিছুটা হয়ত বন্ধুত্বও হয়েছিল। সাপে নেউলে বন্ধুত্ব! বামরা প্রথম ধাক্কা খায় যখন নাহদার বিরুদ্ধে তাদের কাউন্টার রেভ্যুলুশনে দেশের পিতৃতুল্য সাইদ এসেবসি অসমর্থন জ্ঞাপন করেন!তারপর ধীরে ধীরে তাদের বৈঠকের কথা সামনে আসে। দুজনের উপর দিয়েই প্রচ্চণ্ড ঝড়ঝাপটা যায়।

জাস্ট সিচুয়েশনটা একবার কল্পনা করুন যে আল্লামা জোনায়েদ বাবুনগরি আর হাসানুল হক ইনুর মাঝে সমঝোতা হচ্ছে!! হয়ত বাবুনগরি মেনে নিলেন, তার লক্ষ লক্ষ ভক্তবৃন্দ, সমর্থক আর দলের হাজার হাজার নেতাকে মানাবেন কী করে? ইনু শাবাগের বিপ্লবীদের সামলাবে কিভাবে?ঘানুশি এবং এসেবসিকে এর মধ্য দিয়েই যেতে হয়েছে। তাদের বৈঠকের সংবাদটাই টর্নেডোর মত আঘাত হেনেছে। সমঝোতা তো দূর কি বাত।

ঘানুশি ‘মুরতাদ’ হয়ে গেছে বলে যারা বেজায় নাখোশ, তাদের পুনরায় ভাবা উচিৎ। হ্যাঁ, এটা স্বীকারে দ্বিধা নেই ঘানুশি অনেক অনেক ছাড় দিয়েছে, সেই ছাড়ের মূল্যও কিন্তু তাকে চুকাতে হয়েছে।

আজকে তুরস্ক নিয়ে ফ্যাসিনেটেড, একে পার্টি একদিনে এখানে আসেনি। তিন তিনটা ক্যুয়ের পর, নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রির ফাঁসির পর আজকের একেপি। গুনে গুনে পঞ্চাশ বছর লেগেছে এখানে আসতে। তিউনিসিয়ায় তো মাত্র শুরু। সবে শুরু। ধৈর্য ধরুন।

এখন মুরসির মত ঘানুশিকেও হত্যা করা হলে অবাক হব না। এটাই এখন হওয়ার কথা নিয়ম অনুযায়ি। যদি তিনি বেঁচে যান সেটাই বরং ভাগ্য।

ঘানুশি বুঝতে পেরেছিলেন যদি দেশ না থাকে তবে সেক্যুলার কিংবা ইসলামিস্ট কেউই থাকবে না। থাকবে সিরিয়ার মত আস্ত শরণার্থী শিবির। দেশ বেঁচে থাকলে ইসলাম কায়েমের বহু সুযোগ আসবে, ঢের সুযোগ পাওয়া যাবে খিলাফত কায়েমের। রাতারাতি সব পরিবর্তন করতে গেলে শহিদ মুরসির মত পরিণতিই হবে।

অনেকে ভাবেন ইখওয়ানকে বুঝি সিসি মেরেছে। অর্ধসত্য। ইখওয়ান নিজেই মরেছে। ক্ষমতায় আসার পর যখন রাতারাতি দেশ পাল্টে ফেলার অভিযানে নামেন মুরসি, নেমে দেখেন হাতে লোকবল নাই। মোবারকের প্রশাসনকে যে পরিবর্তন করবেন, সেখানে বসানোর মত যথেষ্ট সংখ্যক দক্ষ কর্মী নাই।

ভাবতে পারেন? বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী ইসলামি দল, সমস্ত ইসলামি রাজনৈতিক দলের গুরু ইখওয়ানের হাতেই পর্যাপ্ত লোকবল নেই। আধা মুসলিম আর আধা সেক্যু প্রশাসন পদে পদে মুরসিকে বিঘ্নিত করেছে।

প্রশাসনের বিশাল বিপুল অংশ সমর্থন না করলে সিসির বাপেরও ক্ষমতা ছিল না দেশ দখল করার। রাজনীতিতে কোনকিছুই রাতারাতি হয় না, হবেও না। তিউনিসিয়াতেও এক মেয়াদে সব চেঞ্জ হয়ে যাবে না। ইতিহাসের অসীম দীর্ঘ পথ এখনো সামনে বাকি।

তথ্যসূত্র;
১- The Battle for the Arab Spring Revolution, Counter-Revolution and the Making of a New Era
২- A rage for order the Middle East in turmoil, from Tahrir Square to ISIS

Advertisements