আধুনিকতা, উত্তরআধুনিকতা এবং ইসলাম

এক.
আধুনিকতায় যুক্তি হল সত্যের মাপকাঠি। সত্যে উপনীত হবার শ্রেষ্ঠ উপায় হল যুক্তি এবং বিজ্ঞান। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি হল মানব প্রগতির চাবিকাঠি। ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের লক্ষ্য হল প্রকৃতির নিয়মাবলী উদ্ঘাটন করা। বৈজ্ঞানিক সত্য মেনে চলা আধুনিকতার বৈশিষ্ট্য। যৌক্তিক ও বৈধ কর্তৃপক্ষের প্রতি অনুগত থাকাও এর একটা গুরুত্বপূর্ণ দাবী।

আধুনিকতার ভেতরেই রয়েছে এর খন্ডনের বীজ। আধুনিকতা ধর্মের সত্যকে অগ্রাহ্য করতে গিয়ে প্রান্তিক সংশয়বাদের উপকরণ নির্মাণ করে। অথচ এই প্রান্তিক সংশয়বাদের চোরাবালিতেই আধুনিকতা ডুবে যায়। ফলে মূল্যবোধের এক নৈরাজ্য তৈরি হয়। অবাক করার মত বিষয় হল এই—যে সংশয়বাদকে তৈরি করা হয় অন্ধবিশ্বাসের প্রতিষেধক রূপে, সেই সংশয়বাদ বুমেরাং হয়ে খোদ আধুনিকতাকেই কার্যত একটি নিকৃষ্ট অন্ধবিশ্বাসে পরিণত করে। কাজেই সংশয়বাদ নয়, যা প্রয়োজন তা হল স্রষ্টার প্রতি আনত সমর্পণ।
অপরদিকে উত্তরআধুনিকতা কোনো সার্বজনীন সত্যেই বিশ্বাস করে না। সত্যকে উপলব্ধি ও বোঝার জন্য যে কোনো বস্তুনিষ্ঠ উপায় আছে—এমন কিছুতে উত্তরআধুনিকতা আস্থা রাখে না। বিজ্ঞানকেও একটা মিথলজির স্তরে নামিয়ে নিয়ে আসে। সমস্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ ক্ষমতা-প্রশ্নকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। কোনো রকমের কর্তৃপক্ষের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করতে চায় না।

সব ধরনের অধিবয়ান নাকচ করে দেয় উত্তরআধুনিকতা। “কর্তৃপক্ষ”, “বিশেষজ্ঞ” এবং ক্ষমতার আসনে যারা আছেন—তাদেরকে সন্দেহ করা এর একটা মৌলিক চিহ্ন। এ্ররা যেসব বয়ান ও কাহিনী পেশ করে—সেগুলিকে প্রশ্ন ও চ্যালেঞ্জ করা উত্তরআধুনিকতার আরেকটি দাবী। কারণ কাউকে না কাউকে ক্ষমতার উঁচু-নীচু সোপানের শীর্ষে আসন দেয়াই এসব “গাল-গল্পে”র আসল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বলে এরা মনে করে। ঐতিহ্য ও কেন্দ্রীভূত ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করে এসব নিয়ে গঠিত “ঐকমত্য”কে অন্তর্ঘাতের মাধ্যমে ভেঙে দেয়াই হল এর উদ্দিষ্ট লক্ষ্য।

অন্যদিকে ইসলাম ওহি বা প্রত্যাদেশকে সত্যের মাপকাঠি বলে মর্যাদা দেয়। ইসলামের সত্যে উপনীত হতে হলে নির্ভর করতে হয় অনেকগুলো মাধ্যমের উপর, যেমন ফিতরাত, আকল, হিস এবং ওহি। ইসলামে বিজ্ঞান বলতে বোঝায় আল্লাহর আয়াত বা চিহ্নসমূহের পর্যবেক্ষণ ও পরিবীক্ষণ। এই বিজ্ঞানের পূর্বশর্ত হল ইমান। ফলে আধুনিকতা যে বিজ্ঞানবাদের জন্ম দেয় তা এখানে জন্ম নেয়া সম্ভব নয়। কারণ বিজ্ঞানবাদ হল অযৌক্তিক। ইসলামের পরিমন্ডলে সমস্ত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণের শিকড় আল্লাহর প্রতি ইমানে নিহিত। কাজেই এখানে সব রকমের বৈজ্ঞানিক নিয়মাবলী ও কর্তৃপক্ষের প্রতি জ্ঞানের আলোকে যথাযথ সম্মান ও মর্যাদা পোষণ করা হয়। সুন্নাহ এবং ইজমার প্রতি আনুগত্য তৈরি হয়ে সমাজ ও উম্মাহ গঠিত হয়। এভাবে সুশৃংখলা, সুষমা এবং সৌকুমার্য নিশ্চিত হয়।

ঔপনিবেশিক অভিজ্ঞতার সূত্রে মুসলিম বিশ্বে আধুনিকতা এসেছিল উনিশ ও বিশ শতকে। সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয়ের পদরেখা অনুসরণ করে তা এসেছিল। কিন্তু মুসলিম সভ্যতা এদিক থেকে অনন্য—ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শক্তিগুলি সামরিক, রাজনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত দিক থেকে অনেক অগ্রসর হলেও, সভ্যতার আরো অন্যান্য দিক থেকে ইসলামে অন্তর্নিহিত ছিল এক অনন্য সম্পূর্ণতা ও সমৃদ্ধি; যা খুব দ্রুতই বিশ শতকের মধ্যকাল থেকে মুসলিম বিশ্বকে এক স্বকীয় সভ্যতাভিত্তিক প্রতিরোধ, পুনরুদ্ধার ও পুনর্গঠন আন্দোলন সূচনা করতে সক্ষম করে তুলেছিল।

তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি আধুনিকতা অনেক অধিবয়ান তৈরি করেছে। আর বিশ শতকের শেষে এসে খোদ আধুনিকতাই তার তৈরি করা অধিবয়ানগুলিতে আর বিশ্বাস রাখতে পারছে না। আর এটাই উত্তরআধুনিক শূন্যবাদ বা নিহিলিজম সৃষ্টি করেছে। পাশ্চাত্য সভ্যতার পরিমন্ডল থেকে উৎপন্ন এই আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতার মধ্যে রয়েছে একটি দ্বিমুখী সম্পর্ক। একদিকে আধুনিকতার ধারাবাহিকতায় উত্তরআধুনিকতা এসেছে। কাজেই এক অর্থে উত্তরআধুনিকতাও আধুনিকতারই অঙ্গীভূত সম্প্রসারণ। আবার অন্যদিকে উত্তরআধুনিকতার মধ্যে রয়েছে আধুনিকতার খন্ডন ও ধ্বংসের উপাদান। এই দুই পরস্পর মুখী ও বিমুখী পশ্চিমা বিশ্ববোধকে আমরা পশ্চিমা সভ্যতার একটি বুদ্ধি ও হৃদয়বৃত্তিক মহাসংকট বলে চিহ্নিত করতে পারি।

দুই.
আধুনিকতা, উত্তরআধুনিকতা ও ইসলামের এই বহুমাত্রিক সম্পর্ক নিয়ে সমকালীন কয়েকজন অমুসলিম এবং মুসলিম চিন্তক ও বুদ্ধিজীবিদের অবস্থান জানতে পারলে আমরা বিষয়টিকে আরো ভাল করে বুঝতে পারবো। যেমন ধরুন ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকো জর্মন দার্শনিক ফ্রিডরিখ নীটশের অনুপ্রেরণায় প্রাচ্যকে ভিন্ন লেন্সে দেখতে চেয়েছেন। তিনি এ কারণে ১৯৭৯ সালের ইরানী ইসলামী বিপ্লবকে সহানুভূতি সহকারে দেখেছিলেন। কারণ তিনি ইরানী বিপ্লবের মধ্যে আধুনিক ইউরোপীয় রাজনৈতিক দর্শনের সর্বজনীনতা খন্ডনের চিহ্ন দেখতে পেয়েছিলেন। [১] ফলে তিনি সেক্যুলারিজম ও পণ্যসম্ভোগবাদের বিরোধী হিশেবে ইসলামের ভেতরে উত্তরআধুনিকতার এক সম্ভাব্য মিত্র আবিস্কার করেছিলেন। অথচ ইয়ান আলমন্ড কয়েকজন প্রখ্যাত উত্তরআধুনিক তাত্ত্বিক সম্পর্কে লিখেছেন যে তাদের রচিত উত্তরআধুনিকতার মধ্যে আধুনিকতার মতই প্রায় একই রকমের প্রাচ্যবাদী/সাম্রাজ্যবাদী চিহ্ন বা নকশা খুঁজে পাওয়া যায়; ফলে তিনি এই দুই প্রত্যয়কে খুব একটা ভিন্ন বলতে রাজী নন। [২] ব্রায়ান এস. টার্নার দেখিয়েছেন যে ধর্মীয় স্বীকৃতমত ও এক-আকৃতি বিশিষ্ট রূপকল্প হিশেবে ইসলামও একটি অধিবয়ান বটে; সুতরাং ইসলামও এইসব থেকে ঝুঁকির মধ্যে আছে যেমন তথ্য প্রযুক্তি, গোলকায়ন, জীবনশৈলীর খন্ডায়ন, অতি-পণ্যসম্ভোগবাদ, অবমুক্ত পুঁজিবাজার, জাতিরাষ্ট্রের ক্রমলুপ্তি, ঐতিহ্যানুগ জীবনযাত্রা নিয়ে উৎকেন্দ্রিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা ইত্যাদি। [৩]

আকবর এস. আহমেদ—যিনি মুসলিম বুদ্ধিজীবিদের মধ্যে এই বিষয়ে স্বতন্ত্র গ্রন্থ রচনা করেছেন তিনি উত্তরআধুনিকতা বিষয়ে অনেক ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গী পোষণ করেছেন। তিনি মনে করেছেন যে এতে করে একদিকে পশ্চিমে মুসলিমদের বসবাস করা সহজতর হবে; অন্যদিকে ইসলামীয় অবদানও সহজে অধিপতি গোলোকায়িত সভ্যতায় গৃহীত হতে পারবে। তার মতে উত্তরআধুনিকতা পাশ্চাত্যকে আরো বেশি বহুত্ববাচক এবং সহনশীল করে তুলছে; সুতরাং এই পরিপ্রেক্ষিতে পশ্চিমে ও বিশ্বব্যাপী ইসলামের গ্রহণযোগ্যতা আরো বাড়বে।

জিয়াউদ্দীন সরদার উত্তরআধুনিকতাকে দেখেছেন একদম নেতিবাচক দৃষ্টিতে। তিনি মনে করেন যে ঔপনিবেশিক ও আধুনিক ইউরোপ যেভাবে মুসলিম বিশ্বকে পদদলিত করেছে, উত্তরআধুনিকতা ঠিক সেই লক্ষ্যই ভিন্নভাবে পূরণ করছে। এটি বহুত্বের একটি মায়াজাল তৈরি করেছে মাত্র; যা দিয়ে পশ্চিমা কৃষ্টি, জুলুম এবং অসাম্যকে সে ঢেকে রাখতে চায়। [৪] উত্তরআধুনিকতা যেকোনো চূড়ান্ত সত্যকে অধিবয়ান বলে উড়িয়ে দিতে চায়; সুতরাং জিয়াউদ্দীন সরদার মনে করেন যে উত্তরআধুনিকতার এই সর্বব্যাপী সংশয়বাদ ইসলামকেও একটি অধিবয়ান হিশেবে অগ্রাহ্য করবে। কাজেই তার কাছে উত্তরআধুনিকতাবাদ একটি অত্যন্ত অন্তর্ঘাতী ও বিপজ্জনক মতাদর্শ।

অপরদিকে সালমান সায়ীদ উত্তরআধুনিকতাকে কৌশলগত অবস্থান থেকে গ্রহণ করতে চেয়েছেন। তিনি মনে করেন যে উত্তরআধুনিকতা, আধুনিকতা সম্পর্কে যেসব প্রশ্ন তুলেছে ও চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে—তা তার কাঙ্খিত পুনর্জীবনবাদী ইসলামের উপস্থাপনা ও প্রতিপাদনকে সহজতর করবে। উত্তরআধুনিক আপেক্ষিকতা ও বহুত্ববাদ ইউরোকেন্দ্রিকতার পর্যালোচনা ও সমালোচনাকে অধিক সুযোগ এবং পরিসর দেবে। [৫]
ওভামির আঞ্জুমও সালমান সায়ীদের এই অবস্থানের সঙ্গে সহমত পোষণ করেছেন। তিনি পবিত্র কুরআন থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন যে মহান আল্লাহতায়ালা অনেকসময় প্রতিপক্ষকে বিভক্ত করে দুর্বল করে দেন; আধুনিকতা ও উত্তরআধুনিকতা বিতর্ক ঠিক তেমনি একটি পরিস্থিতি হাজির করেছে। যেখানে পাশ্চাত্য তার এনলাইটেনমেন্ট প্রকল্পে আত্মবিশ্বাস আগের তুলনায় অনেকখানি হারিয়ে ফেলেছে। পাশ্চাত্য জীবনদর্শন দ্বিধাবিভক্ত হয়ে একধরনের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিজীবিদের কাজ হবে এই বিভক্তি ও অন্তর্দ্বন্দ্বকে এর যৌক্তিক পরিণতির দিকে ধাবিত হতে দেওয়া এবং এর পূর্ণ সদ্ব্যবহার করা। ইসলামের মৌলিক স্বাতন্ত্র্য ও অনন্য বৈশিষ্ট্যকে এই দুই পশ্চিমা জীবনবোধের পারস্পরিক লয়ের মধ্য দিয়ে উন্মোচিত এবং উচ্চকিত করে তোলা।।


রেফারেন্স:

[১] Ian Almond, The New Orientalists: Postmodern Representations of Islam from Foucault to Baudrillard, London, I. B. Tauris, 2007, p. 30, 35
[২] প্রাগুক্ত, p. 4
[৩] Bryan S. Turner, Review of Postmodernism and Islam:
Predicament and Promise, by Akbar S. Ahmed, Modern Asian
Studies 27, no. 4 (1993): p. 902
[৪] Ziauddin Sardar, Postmodernism and the Other: The New
Imperialism of Western Culture, London: Pluto Press, 1998, p. 37-38
[৫] Salman Sayyid, A Fundamental Fear: Eurocentrism and the Emergence of Islamism, 2nd ed. London: Zed Books, 2003, p.

Advertisements