অসময়ের ভাঙনে বিলীনের

নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নের জনতাবাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী রাকির হোসেন রকি। কথা ছিল এ বছর পঞ্চম শ্রেণীতে পা দেয়ার। কিন্তু করোনায় দীর্ঘ প্রায় এক বছর বিদ্যালয় বন্ধ। তবে সকাল-দুপুর কিংবা বিকাল, যখনই সুযোগ পেত বিদ্যালয়ের মাঠে এসে ঘুরে যেত। খেলত প্রিয় সঙ্গীদের সঙ্গে। করোনা টিকা শেষ হলে খুলতে পারে বিদ্যালয়, সরকারি এমন ঘোষণায় উচ্ছ্বসিতও ছিল রকি। কিন্তু দুর্ভাগ্য, সম্প্রতি মেঘনা নদী থাবা বসিয়েছে তার স্বপ্নের বিদ্যালয় ভবনে।

পানির তোড়ে সরে গেছে বিদ্যালয় ভবনের দক্ষিণ অংশের মাটি। ফাটলও ধরেছে বিভিন্ন অংশে। যেকোনো মুহূর্তে বিলীন হয়ে যাবে পুরো ভবনটি। এ যেন তার স্বপ্নের মৃত্যু।

সম্প্রতি সরেজমিনে পরিদর্শনে গেলে কোমলমতি এ শিশু শিক্ষার্থী জানায়, এর আগেও দুবার ভাঙনের শিকার হয়েছে তার পরিবার। দুবার স্কুল বদলানোর পর তিন বছর আগে জনতা বাজার এলাকায় বসতি গড়ে। তারপর ভর্তি হয় জনতা বাজার বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। এবারো সে বিদ্যালয়টিও নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়ার প্রহর গুনছে।

শুধু রকি নয়। এমন অসংখ্য শিশু শিক্ষার্থী বার বার বিদ্যালয় পরিবর্তন করেও স্বপ্নকে স্থির করতে পারেনি। চানন্দী ইউনিয়নে ছয়-সাত বছরে অন্তত ১০টি ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে নদীর পানি গড়াগড়ি করছে জনতা বাজার বহুমুখী আশ্রয়ণ কেন্দ্র ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভবনের পাশে। যেকোনো মুহূর্তে ভবনটি নদীগর্ভে বিলীন হবে। ভবনটির পাশাপাশি নদী খুব কাছে চলে এসেছে ফরিদপুর ও হেমায়েতপুর স্কুল ভবন দুটিরও। সেগুলোও আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নদীগর্ভে বিলীন হবে।

ফরিদপুর বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক জাফর ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, জনতা বাজার, ফরিদপুর ও হেমায়েতপুর বেসরকারি বিদ্যালয় তিনটিতে এক হাজারেও বেশি শিশু শিক্ষার্থী রয়েছে। এ বিদ্যালয় ভবনগুলো নদীগর্ভে বিলীন হলে তাদের শিক্ষাজীবন বিপন্ন হতে পারে।

তিনি বলেন, ছয়-সাত বছরে চানন্দী ইউনিয়নের ১০ বিদ্যালয় ভবন নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।

জাহাঙ্গীর হোসেন নামে স্থানীয় ব্যবসায়ী জানান, জনতা বাজার স্কুল ভবনটি মূলত নির্মিত হয়েছে আশ্রয়ণ শেল্টার হিসেবে। বন্যা জলোচ্ছ্বাসসহ যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগে আশ্রয় হিসেবে উপকূলের মানুষের ভরসা ছিল ভবনটি। এটি বিলীন হলে হুমকির মুখে পড়বে চার শতাধিক শিশুর শিক্ষাজীবন। পাশাপাশি এ এলাকার মানুষ জলোচ্ছ্বাসে আশ্রয়হীন হয়ে পড়বে।

একাধিত সূত্রে জানা গেছে, ২০১১-১৮ সাল পর্যন্ত হাতিয়ার শুধু চানন্দী ইউনিয়নেই নির্মাণ হয়েছে ৩০টি পাকা ভবন। বাংলাদেশ, নেদারল্যান্ডস সরকার এবং ইফাদের যৌথ অর্থায়নে চর উন্নয়ন ও বসতি স্থাপন প্রকল্পের অধীন নির্মিত প্রত্যেকটি ভবন ছিল দোতলাবিশিষ্ট। প্রত্যেকটি ভবন নির্মাণে প্রায় পৌনে দুই কোটি টাকা করে খরচ হয়েছে। এ ভবনগুলোয় বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিচালনা হয়ে আসছে। আর বন্যা বা জলোচ্ছ্বাস দেখা দিলে ব্যবহার হয় আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে। কিন্তু ছয়-সাত বছরে ১০টি ভবন নদীগর্ভে তলিয়ে গেছে। এছাড়া এ সময়ের মধ্যে অন্তত ২৫ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। মাদ্রাসা, মসজিদ ও মন্দির মিলিয়ে অর্ধশতাধিক প্রতিষ্ঠানও গেছে নদীর গহ্বরে। বাস্তুহারা মানুষগুলো তাদের বসতি খুলে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছে সড়কের পাশে। আশ্রয় নিয়েছে বিভিন্ন বাড়িতে, রাস্তার পাশে।

স্থানীয়রা জানান, শীত মৌসুমে এমনভাবে নদীভাঙন তারা আগে দেখেনি। গত দুই-তিন বছর বর্ষায় যেভাবে ভাঙত, ঠিক শীত মৌসুমেও একইভাবে ভাঙছে। যদি বর্ষা আসার আগেই কোনো ব্যবস্থা না নেয়া হয়, তাহলে অন্তত আরো ২০ হাজার পরিবার বাস্তুচ্যুত হবে। বাঁচানো যাবে না বিদ্যালয় ভবনগুলো। নদী শাসনের মধ্য দিয়ে ব্ল্যাকবাঁধ নির্মাণ করে হাতিয়ার এ বিশাল জনপদকে রক্ষার আকুতি ভুক্তভোগীদের।

হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইমরান হোসেন বলেন, এখনই নদী ভাঙনরোধ করা সম্ভব নয়। তবে একটি বড় প্রকল্প একনেকে পাস হওয়ার পথে। প্রকল্পটি পাস হলেই হাতিয়ার নদীভাঙন রোধ করা সম্ভব।

তিনি বলেন, বিদ্যালয়গুলো ভেঙে নেয়ার সুযোগ নেই। তবে যেসব বিদ্যালয়ের সন্নিকটে নদী পৌঁছেছে, সেখানকার বিদ্যালয়ের আসবাব সরিয়ে নিতে বলা হয়েছে। অস্থায়ীভাবে ঘর নির্মাণ করে সেখানে বিদ্যালয় পরিচালনা করা হবে।

সূত্রঃ বণিক বার্তা